কোথায় প্রত্যেক মানুষের স্বাতন্ত্র্য? : আরাফাত হোসাইন

 কোথায় প্রত্যেক মানুষের স্বাতন্ত্র্য?

আরাফাত হোসাইন



বাহ্যিক, জৈবিক, অথবা গঠনগত দিক থেকে মানুষে মানুষে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই, ভেদ নেই। কিছু সংখ্যক ব্যাতিক্রম ছাড়া আমাদের প্রায় সকল মানুষেরই দুটি হাত, দুটি পা, দুটি চোখ, নাক, মুখ, মস্তিষ্ক এবং অবশ্যই একটি হৃদপিন্ড থাকে। সুতরাং জৈবিকভাবে মৌলিক বা অভাবনীয় তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য আমাদের নেই। তবু আমরা কেন এবং কীভাবে প্রত্যেক মানুষই আলাদা, স্বাতন্ত্র্য, ভিন্ন? কীভাবেই বা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ বহন করে আলাদা পরিচয় এবং বৈশিষ্ট্যগত ভিন্নতা? শরীরবৃত্তীয় বা গঠনগত দিক থেকে যদি অভাবনীয় মৌলিক কোনো পার্থক্য আমাদের না-ই থাকবে, তবে কেনই বা কিছু কিছু মানুষের সংস্পর্শে আমরা পুলকিত হই, আর কিছু মানুষের সংস্পর্শে হই বিরক্ত? কেনই বা কিছু মানুষের সাথে আমাদের হৃদয়ের যোগাযোগ হয় সুপ্রশন্ন, সুন্দর, সুখকর? আর কেনই বা কিছু মানুষের সাথে আমাদের তৈরি হয় দূরত্ব? কেন আমরা প্রত্যেকেই আমাদের চারিপাশের সকলের সাথে সর্বদাই একটা অভিন্ন সম্পর্ক বজায় রাখতে পারি না? মানুষ ভেদে এমন ভালো লাগা বা মন্দ লাগার কী সেই রহস্য?

প্রকৃতপক্ষে, আমাদের স্বাতন্ত্র্য, ভিন্নতা, বৈচিত্রতা লুকিয়ে আছে বা থাকে আমাদের রুচিবোধে, আমাদের আচরণে, আমাদের স্বীদ্ধান্তে, আমাদের চিন্তায়, জীবনদর্শনে, মননে, মানসে, মগজে। এইসবই একজন মানুষকে আরেকজন মানুষ থেকে সূক্ষ্মভাবে আলাদা করে, আলাদা রাখে। এগুলো ছাড়া আমাদেরকে পৃথকভাবে সনাক্ত করার ও মৌলিক কোনো উপাদান নেই। আর তা না থাকলে - যা রহিম তা-ই করিম। যা বাহান্ন, তাহাই তেপ্পান্ন! সুতরাং ঐ নিয়ামকগুলো আছে বলেই আমরা পৃথকভাবে বিভিন্ন জনকে বুঝতে পারি, এবং তাদেরকে বিভিন্নভাবে অনুভব করতে পারি। আর ঐসকল নিয়ামকের কারনেই একজন মানুষ হয়ে ওঠেন নেলসন ম্যান্ডেলা কিংবা হিটলার। একজন মানুষকে যখন আমরা দেখি, তার বাহ্যিকতা দেখার পাশাপাশি আমরা অবচেতনে সেই মানুষটির মাঝে ঐ নিয়ামকগুলো কি মাত্রায় এবং কিভাবে সজ্জিত আছে মূলত তা-ই দেখি। এবং সেই অনুযায়ী অদূর ভবিষ্যতে সেই মানুষটিকে আমরা কতটা প্রাধান্য বা গুরুত্ব দেবো সেই মুহুর্তেই সেটার একটা প্রাথমিক হিশেবনিকেশ করে ফেলি। অবশ্য কেউ-কেউ সেই হিশেব করতে কিছুটা বা অনেকটা সময়ও নেই। সেটা যার যার ব্যাক্তিগত এনালিটিকাল এবিলিটির উপরেই নির্ভরশীল। দেখুন, আপনার সকল বন্ধুই কিন্তু আপনার কাছে একই মাত্রার গুরুত্ব বা প্রাধান্য পায় না। কিংবা আপনি যার সাথে এখন প্রণয়ে জড়িয়ে আছেন তার ভেতরে নিশ্চই এমন কিছু আছে যা আপনাকে কোনো না কোনো ভাবে মোহিত করে। আবার, আপনি আপনার অতীত বা বর্তমানের সকল শিক্ষকদেরকেই সমান ভাবে ভালোবাসেন না, পছন্দও করেন না। কিংবা আপনার সকল সহকর্মীর সাথেও আপনার সম্পর্ক একই রকম নয়। মানুষভেদে তাদের গুরুত্ব, প্রাধান্য, গ্রহণযোগ্যতা আপনার কাছে এক নয়, বরং ভিন্ন। আর এসবের পেছনে লুকায়িত আছে ঐ কটি নিয়ামক, যা কিছুক্ষণ আগেই উল্লেখ করেছি। যদিওবা আমরা প্রত্যকে জৈবিক ভাবে সেই একই আকৃতির-ই মানুষ, এবং মৌলিকভাবে অভিন্ন, তবু আমরা ঐ সকল উল্লেখিত কতকগুলো মনস্তাত্ত্বিক উপাদানগুলোর কারনে প্রত্যেকেই সাংঘাতিক রকমের আলাদা ও স্বাতন্ত্র্য। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক রুচিবোধ, আচরণ, সীদ্ধান্ত, দর্শন, চিন্তাই আমাদেরকে সূক্ষ্মভাবে আলাদা ও পৃথক করে রাখে একে অন্যের থেকে। আর এগুলোই আমাদের মৌলিক পরিচয় বহন করে। এছাড়া আমাদের একে অন্যকে আলাদা করার ধ্রুপদী কোনো মাপকাঠি বা দাঁড়িপাল্লা নেই। মোটাদাগে ঐগুলোই আমাদের স্বাতন্ত্র্য।

No comments

Theme images by merrymoonmary. Powered by Blogger.