"স্বাধীন চিন্তা বলতে কী বোঝায়?" : বারট্রান্ড রাসেল
স্বাধীন চিন্তা বলতে কী বোঝায়?
কোন চিন্তাকে স্বাধীন চিন্তা বলা যায়?
বারট্রান্ড রাসেল
স্বাধীন চিন্তা বলতে কি বোঝায় তাই নিয়ে আমাদের আলোচনা শুরু করা যাক। এ বক্তব্যের আবার দু’রকম তাৎপর্য আছে। সংকীর্ণ অর্থে স্বাধীন চিন্তা বলতে প্রাচীন ধর্মসমূহের মতবাদকে অস্বীকার করা বোঝায়। এ অর্থে যে লোক মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, সিন্টো ধর্মমত অথবা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অন্য কোন মতবাদকে সত্য বলে বিশ্বাস করেন না তাঁকে স্বাধীন চিন্তাবিধ বলা যায়। খ্রিষ্টান অধিবাসীদের দেশে যে মানুষ আল্লাহকে বিশ্বাস করেন না তাঁকে স্বাধীন চিন্তাবিদ বলা হয়, আবার বৌদ্ধদের দেশে শুধুমাত্র স্রষ্টার প্রতি অবিশ্বাসই স্বাধীন চিন্তাবিদ হওয়ার প্রয়োজনীয় গুনাবলী নয়।
এ অর্থে স্বাধীন চিন্তার প্রয়োজনীয়তা আমি কম করে দেখতে চাইনে। আমি নিজে সর্ব প্রকার ধর্মমতকে অধিকার করি এবং বিশ্বাস করি যে সব প্রকারের ধর্ম বিশ্বাসের বিলয় ঘটবে। ধর্মীয় বিশ্বাস আল্লাহকে পাওয়ার শক্তি বিশেষ একথায় আমি সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করি না। আমি সব সময় স্বীকার করতে রাজি আছি বিশেষ বিশেষ যুগের বিশেষ বিশেষ স্থানে ধর্মের কিছু সুফল ফলেছে, তখন ছিল মানুষের বিচার বুদ্ধির শৈশব অবস্থা আমরা এখন সে স্তর অতিক্রম করে যাচ্ছি।
![]() |
| Bertrand Russell British philosopher |
কিন্তু এ ছাড়াও স্বাধীন চিন্তার বৃহত্তর দিগন্ত রয়েছে, আমি তার প্রয়োজন আরো তীক্ষ্ণতম বলে মনে করি। প্রকৃত প্রস্তাবে পুরনো ধর্মগুলো যে মানুষের উদারতার দিগন্ত সম্বন্ধে চিন্তার পথ রুদ্ধ করেছে এ সত্য অনুসন্ধান করলে জানা যাবে সংকীর্ণ অর্থে স্বাধীনচিন্তাকে যত সহজে সংজ্ঞায়ন করা তত সহজ নয় এবং এর মূল তাৎপর্যে পৌঁছুতে হলে কিছু সময় ব্যয় করা সুবিধাজনক হবে।
যখন আমরা কোন কিছুকে স্বাধীন বলি তা কী এবং কিসের থেকে স্বাধীন তা–বলা পর্যন্ত কোন সুনিদিষ্ট অর্থ ফুটে উঠেনা। কোন কেউ অথবা কোন কিছু যখন বাহ্যিক বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত তখন তাকে স্বাধীন বলা যায়। সংক্ষেপে বলতে গেলে আমাদের বলা উচিত তা কী ধরনের বাধ্যবাধকতা। সব সময় বর্তমান কিছু পরিমাণ বাহ্যিক বাধা থেকে মুক্ত যখন তখনই চিন্তাকে স্বাধীন বলা যায়।এর মধ্যে কতেক স্পষ্ট প্রতিবন্ধক আছে, চিন্তার স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে সে গুলোর অপসৃতি একই প্রয়োজন। কিন্তু এ ছাড়া আরো বাধা আছে, যেগুলো সূক্ষতর এবং সহজে ধরা যায় না।
স্পষ্টতর প্রতিবন্ধক সমূহকে নিয়ে শুরু করা যাক। চিন্তা তখন স্বাধীন থাকতে পারে না, যখন কোন মতামতকে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস করলে দণ্ড দিতে হয় অথবা কোনো বিষয়ে বিশ্বাস করা বা বিশ্বাস না করার জন্যে কৈফিয়ত দিতে হয়। পৃথিবীর খুব স্বল্পসংখ্যক দেশে এখন পর্যন্ত এ সামান্য স্বাধীনতাটুকু পর্যন্ত নেই। ইংল্যাণ্ডে আল্লাহর আইনানুসারে খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি অবিশ্বাসের কথা উচ্চারণ করা বেআইনী; যদিও সঙ্গতিপন্নদের বিরুদ্ধে সে আইন কখনও কার্যকরী নয়। খ্রিষ্ট যা শিক্ষা দিয়েছেন এবং যে বিষয়গুলো খ্রিস্টের শিক্ষার পরিপন্থী সেগুলো শিক্ষা দেওয়াও বেআইনী। সুতরাং যে কেউ অপরাধী হতে না চাইলে তাকে বলতে হবে তিনি যীশুখ্রিস্টের শিক্ষার সঙ্গে একমত কিন্তু খ্রিস্ট কী বলে গেছেন তা মুখ ফুটে বলতে পারবেন না। নৈরাজ্যবাদ এবং বহুবিবাহে বিশ্বাস করে না এবং একবার অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে তাকে সাম্যবাদকেও অবশ্যই অবিশ্বাস করতে হবে। জাপানে মিকাডোর স্বর্গীয় উত্তরাধিকারীত্বের প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশ করা বেআইনী। সুতরাং দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর চারদিকে ভ্রমণ করে আসাটা বিপজ্জনক অভিযানের মতো। একজন মুসলমান একজন তলস্তয় পন্থী একজন বলশেভিক অথবা একজন সাম্যবাদী কিছু অংশে অপরাধী না হয়ে এ কাজ করতে পারে না অথবা তিনি গুরুত্বপূর্ণ সত্য বলে মনে করেন সে ব্যাপারে তার জিহ্বা একেবারে বন্ধ রাখতে হবে। কিন্তু এ ব্যবস্থা তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রীদের জন্য সেলুনে যারা ভ্রমণ করেন তারা গায়ে পড়ে কোন ক্ষতিকর কিছু না করে যা ইচ্ছে তা বিশ্বাস করতে পারেন।
![]() |
| Bertrand Russell |
এটা পরিস্কার যে চিন্তাকে স্বাধীন করতে হলে প্রথমতঃ মতামত প্রকাশের জন্য যে আইনত দণ্ডের ব্যবস্থা রয়েছে তা প্রত্যাহার করতে হবে। কোন বিশাল দেশ এখনো এই স্তরের স্বাধীনতাও অর্জন করেনি, যদিও অনেক দেশ মনে করে যে তারা জনসাধারণকে অনুরূপ স্বাধীনতা দিয়েছে। যে মতবাদগুলো এখন মানুষকে ভয়ঙ্করভাবে পীড়ন করছে সেগুলোর প্রকোপ এত ভয়ানক এবং এগুলো এতই নীতিহীন যে তার প্রতি অধিকাংশ মানুষকে সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করতে বলা এরকম অসম্ভব। যে কারণে মনের অনুসন্ধিৎসু প্রবৃত্তি নিপীড়ত, একই কারণে এ সকল দৈত্যের মতো প্রতিবন্ধকের সৃষ্টি হয়েছে। আজকের যুগের বলশেভিক মতবাদকে যে রকম ভাবা হয়, এমন এক সময় ছিল যখন প্রোটেষ্টান্ট মতবাদকেও তেমনি মারাত্মক ভাবা হতো। দয়া করে এ মন্তব্য থেকে আমাকে কেউ বলশেভিক অথবা প্রোটেষ্টান্ট ভাববেন না।
সে যাহোক আধুনিক পৃথিবীতে আইনত শাস্তি হলো চিন্তার স্বাধীনতার প্রাথমিক প্রতিবন্ধক। আর অন্য দুটো বাধা হলো অর্থদণ্ড এবং প্রমাণকে বিকৃত করবার বাধা। যদি কোন মতবাদের ফলে মানুষের জীবনধারণের পেশা মুক্ত হতে না পারে তাহলে চিন্তার যে স্বাধীনতা থাকতে পারে না সে কথা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। আরো পরিষ্কার যে কোন বিতর্কিত বিষয়ে অন্যদিকের যুক্তি শ্রমসাধ্য অনুসন্ধানের দ্বারা আবিস্কার না করে একদিকের যুক্তিকে পুনঃ পুনঃ সুন্দরভাবে আকর্ষণীয় করে তুললে সেখানেও চিন্তার স্বাধীনতা বিঘ্নিত হয়। আমার জানা মতে চীনদেশ ছাড়া সকল বড় দেশে এ দুরকমের প্রতিবন্ধক বর্তমান স্বাধীনতার শেষ আবাসস্থল ছিল (বা আছে) চীনদেশ। এ সকল বাধা তাদের বর্তমান ব্যাপকতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা, এবং তা হ্রাস কিভাবে করা যায় তাই হলো আমার আলোচনার বিষয়।
বিশ্বাসসমূহের সঙ্গে স্বাধীন প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে পারলে আমরা চিন্তাকে স্বাধীন বলতে পারি। তার মানে, যখন সকল রকমের বিশ্বাস নিজস্ব বা কোন প্রকার আইনগত অথবা অর্থনৈতিক সুবিধা বা অসুবিধা থেকে মুক্ত হয়ে প্রকাশ করতে সক্ষম। এটা হচ্ছে একটা আদর্শ, বিভিন্ন কারণে তার পুরোপুরি কখনো অর্জন করা যাবে না। আমরা বর্তমানে যেমন করি তেমনি না হাতড়ে অধিকতর সন্নিকটে এর আহবান গিয়ে পৌঁছবে।
_____
- লেখক ঃ বারট্রান্ড রাসেল - সংশয়ী রচনা (Sceptical Essays)
- অনুবাদ ঃ আহমদ ছফা



No comments