শাহ্ আবদুল করিম; যিনি আমার হৃদয়ের খুবই কাছের : আরাফাত হোসাইন
শাহ্ আবদুল করিম; যিনি আমার হৃদয়ের খুবই কাছের
আরাফাত হোসাইন
Ø
“মন মজালে ওরে বাউলা গান”
Ø
“আগে
কি সুন্দর দিন কাটাইতাম”
Ø
“আর
কিছু চাইনা মনে গান ছাড়া”
Ø
“কেন
পিড়িতি বাড়াইলা রে বন্ধু”
Ø
“কোন
মিস্তরি নাউ বানাইলো”
Ø
“আগের
বাহাদুরি এখন গেল কই?”
এমনই
সহস্র গানের স্রষ্টা বাউল সম্রাট শাহ্ আবদুল করিম; নি:সন্দেহে তিনি একজন সম্রাট। যদিও সম্রাট সুলভ অহমিকা
তাঁর ছিল না। তিনি ছিলেন নিতান্তই একজন সাধারণ মানুষ। তাঁর চলনে-বলনে-ভাবনায়
সবখানেই তিনি সাধারণ। বলতে হয়, তিনি ছিলেন একজন সহজ মানুষ। আর এই কারণেই বোধয় তিনি
এতোটা জনপ্রিয়। বাংলার কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, শিক্ষিত অথবা নিরক্ষর সকলের মুখেই
তাঁর গান, তাঁর সুর। আর এখানেই তাঁর সফলতা। তিনি তাঁর গানের মধ্যামে বলে গেছেন
সমাজের সকল স্তরের মানুষের কথা। বলে গেছেন গণমানুষের কথা। বলে গেছেন জীবনের সুখ-দু:খ, আনন্দ-বেদনা এবং মানবজীবনের গভীর বোধ এবং
উপলব্ধির কথা।
শাহ্
আবদুল করিম আমার হৃদয় এবং আত্মার ভীষণ কাছের একজন মানুষ। যার জীবন, কর্ম, সঙ্গীত
আমাদের সকলের জন্যই এক বিশেষ অনুপ্রেরণা, এক বিরল দৃষ্টান্ত। যার নেই কোনো
অক্ষরজ্ঞান, নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা; তবু তাঁর মেধার ধার অকল্পনীয়। বাংলার
মাটি, মানুষ ও জীবন সম্পর্কে তাঁর যেই মানবিক দর্শন তা রীতিমত আমাদের অবাক না করে
পারে না। এই বাংলায় যত মহৎ প্রাণের জন্ম হয়েছে, এযাবৎকালে যত মনিষী জন্মেছেন, শাহ্
আবদুল করিমকে বাদ দিয়ে সেই আলোচনা অসম্ভব। তিনি সত্যিই এক বিরাট বিস্ময়!
কালনী
নদীর তীরে, ঐরকম অবহেলিত অজপারাগায়ে এমন উজ্জ্বল এক মানুষের জন্ম, বেড়ে ওঠা, এবং
দিনের পর দিন একজন শাহ্ আবদুল করিম হয়ে ওঠা সত্যিই কল্পনা করা যায় না। যার গান
সর্বদাই আমার মনে তৈরি করে এক অজানা মোহ! তাঁর মত একজন মহান মানুষকে নিয়ে আলোচনা,
ব্যাখ্যা কিংবা বিশ্লেষণ আমার মত একজন আনাড়ি লোকের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তবু আমার
স্বল্প জ্ঞানে আজ তাঁকে স্মরণ করছি।
সুদীর্ঘ
বর্ণাঢ্য জীবন শাহ্ আবদুল করিমের। কত মানুষ, কত গান, কত অভিজ্ঞতা, কত ইতিহাস তাঁর
জীবনে! অথচ সেরকম সম্মান, মনযোগ, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা যেমনটা তাঁকে দেওয়া দরকার
ছিল তা আমরা তাঁকে দিতে পারিনি, কখনোই পারি না। যার পরতে পরতে, রক্তে,
শিরায়-উপশিরায়, মস্তিষ্কে, মননে, চিন্তায়, ভাবনায়, শয়নে, স্বপনে, গান আর গান;
আমাদের কী সাধ্য তাঁকে ধারণ করা? আমাদের কী সাধ্য তাঁকে বোঝা?
বংলার
এক বিস্ময়ের নাম - শাহ্ আবদুল করিম। তাঁর কথা, তাঁর গান, তাঁর সুর আমাকে ভীষণভাবে
আন্দোলিত করে, মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। এমন মানুষ আর হবে না, আর হবে না! আমাদের
সাত পুরুষের ভাগ্য আমরা একজন শাহ্ আবদুল করিমকে পেয়েছিলাম। জ্ঞানে, গুণে,
প্রজ্ঞায় যার তুলনা সে নিজেই।
প্রকৃতিকে,
মানুষকে এবং জীবনকে ভীষণ কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। আর এটাই বোধয় একজন প্রকৃত শিল্পী,
প্রকৃত দার্শনিক এবং একজন প্রকৃত মানুষের কাজ। তিনি শৈশবে বিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন
হাতেগোনা দুই-তিনদিন। এরপর আর যাওয়া হয়নি বিদ্যালয়ে। নিজে নিজেই শিখেছেন অক্ষর। আর
তারপর বাকিটা ইতিহাস। অজস্র কালজয়ী গানের স্রষ্টা তিনি। আমাদের মতো নতুন প্রজন্মের
ছেলেমেয়েদের জন্য তাঁর জীবন দারুণ এক অনুপ্রেরণা।
![]() |
| রুহী ঠাকুর এবং রণেশ ঠাকুর |
প্রকৃতপক্ষে
শাহ্ আবদুল করিমকে যারা ভালোবাসেন এবং যারা তাঁর সঙ্গীতের প্রকৃত অনুরাগী, তারা
অবশ্যই জেনে থাকবেন এই দুটি নাম - রুহী ঠাকুর এবং রণেশ ঠাকুর। এই দুজন মানুষ
শ্রদ্ধেয় শাহ্ বদুল করিমের সরাসরি শিষ্য। শাহ্ আবদুল করিমের অসংখ্য গান তাঁরা
গেয়েছেন। তাঁরা দুজনেই ঐ অঞ্চলের বেশ নামি শিল্পী। দু:খের বিষয়, প্রিয় রুহী ঠাকুর আমাদের মাঝে আর নেই।
অসাধারণ এক গানের ভাণ্ডার ছিলেন তিনি। ভীষণ মিষ্টি কণ্ঠ। ঠিক তেমনি আরেকজন - রণেশ
ঠাকুর। তাঁরা শিষ্যরা কেউ কারো থেকে কম নন! শ্রদ্ধেয় শাহ্ আবদুল করিমের প্রকৃত গানের
স্বাদ যদি কেউ পেতে চায় তবে তাকে অবশ্যই অবশ্যই এই দুইজন শিল্পীর গান শুনতেই হবে।
নইলে আপনি এবং আপনার জ্ঞান অবস্থান করবে শাহ্ আবদুল করিম থেকে যোজন যোজন দূরে!
প্রিয়
রনেশ ঠাকুরকে এক সাক্ষাৎকারে বলতে শুনেছিলাম, শাহ্ আবদুল করিমের প্রায় তিন থেকে
চারশো গান তাঁর মুখস্থ। আহা! গুরুর প্রতি এই না হলে ভালোবাসা! ভাবা যায়! এই দুজন
শিল্পীর কন্ঠে যখন শাহ্ আবদুল করিমের গানগুলো শুনি, তখন যেন আমি আর আমি থাকি না। ভীষণ মায়া
দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে গান গায় তাঁরা। এই মানুষগুলোকে আমাদের বাঁচিয়ে রাখতেই হবে।
এরা আমাদের সম্পদ।
ইন্টারনেটের বদৌলতে অনেক কিছুর অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগই আজকাল আমাদের হয়েছে। এমনকি সয়ং শ্রদ্ধেয় শাহ্ আবদুল করিমের কন্ঠে গান শোনার পরম সৌভাগ্যও হয়েছে অনেকেরই। এ সত্যিই অকল্পনীয়!
![]() |
| রুহী ঠাকুর এবং শাহ্ আবদুল করিম |
বেশ
কয়েকবছর আগে একদিন হঠাৎ চোখে পড়ল এমনই একটি অসাধারণ ভিডিও।
ভিডিওর টাইটেল দেখে বুঝলাম শাহ্ আবদুল করিম লন্ডনে। দেখলাম, স্যুট, কোট, টাই পরে একটি
উজ্জ্বল কামরায় বসে বেহালা হাতে মধ্যবয়স্ক শাহ্ আবদুল করিম একমনে গান গাইছেন। তাঁর
সাথে ছিলেন শিষ্য যুবক রুহী ঠাকুর। ভিডিওটা দেখে আমি যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছিলাম।
এমন এক মুহূর্ত দেখার ভাগ্য কোনোদিন হবে সেটা সত্যিই কোনোদিন ভাবিনি! দেখলাম, একের
পর এক চলছে গুরু-শিষ্যের গান গাওয়া। দুজনেই গভীরভাবে মেতে আছেন গানে। একবার গাইছেন
রুহী ঠাকুর একবার গাইছেন শাহ্ আবদুল করিম। আহা! কি এক খাসা অভিজ্ঞতা! ভিডিওটা খুব
সম্ভবত ১৯৮০ সালে রেকর্ড করা। আমি নিশ্চিত নই; ধারণা করে বললাম। এর আগে পরেও হতে পারে।
আমি যতবারই ভিডিওটা দেখি, ততবারই আমি যেন কিছু সময়ের জন্য ফিরে যাই সেই সময়ে, সেই দেশে,
সেই মুহূর্তে - দুজন সৃজনশীল মানুষের কাছে! অত:পর সময়কে আবার
আমার ধীক্কার জানাতে ইচ্ছা হয়। ঘৃণা করতে ইচ্ছা করে। যখন মনে পরে তাঁরা আজ গত,
তখনই আমি এক গভীর বিষন্নতায় ডুবে যাই আমার বুকের মাঝে তৈরি হয় বিরাট এক শুণ্যতা,
হাহাকার। সেই ভিডিওতে দেখা যায় দুজন মানুষ কত সজীব, কত জীবন্ত, কত প্রাণময়! অথচ
তাঁরা কেউই আজ বেঁচে নেই। মহাকাল, তুমি কেন সবকিছু কেড়ে নাও?
আমাদের উচিত শাহ্ আবদুল করিমের জীবন, কর্ম,
গান, দর্শন ইত্যাদি নানাবিধ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ এবং গবেষণা করা; তাঁর সৃষ্টিকর্মকে
সমগ্র বিশ্বের কাছে তুলে ধরা। এমন ক্ষণজন্মা মানুষটিকে আমাদের জীবনে, চিন্তায়,
মননে ধারণ করা। আমাদেরকে আরো উন্নত, আরো সুন্দর মানুষ এবং সর্বোপরি একজল আসল মানুষ
হিসেবে তৈরি হতে তাঁর সৃষ্টিকর্মের ভূমিকা অপরিহার্য। তাঁর প্রতিটি গানের মাঝেই
আছে ভীষণ রকমের চিন্তার খোরাক।
আমার বন্ধু ‘ওমর ফারুক’ কয়েক বছর আগে একবার গিয়েছিল শাহ্ আবদুল করিমের বাড়িতে। তাঁর বাড়িতে যেতে না-কি মারাত্মক ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল! সেখানকার যোগাযোগ ব্যাবস্থা খুব একটা সহজ নয়। তারপরেও মানুষ যায় এই মহান মানুষটির গৃহে; তাঁর স্মৃতিকে তাজা করতে। তাঁর ঘর-উঠোন এবং তাঁর স্মৃতি বিজড়িত সকল জিনিসগুলোকে একটিবার দেখতে। শুধুমাত্র তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসা আছে বলেই। এমন সোনার মানুষ আর হবে না।
![]() |
শাহ্ নূর
জালাল |
শাহ্ আবদুল করিমের একমাত্র পুত্র শাহ্ নূর
জালাল আমার বন্ধু ওমর ফারুককে তাঁর বাবার সমস্ত কিছু অতি আগ্রহে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে
দেখিয়েছেন। ভীষণ আন্তরিক এক মানুষ তিনি। তিনিও তাঁর বাবার মতই গান-বাজনা নিয়েই
থাকেন। ইতোমধ্যেই তিনি বেশ কিছু বিখ্যাত গান-ও রচনা করেছেন। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য
একটি গান হলো – ‘এই মিনতি করি তোমায়, ছেড়ে যাইও না’ এই গান ওখানকার সকলের মুখে
মুখেই বাজে। বাবাকে উদ্দেশ্য করেই তিনি মূলত এই গানটি রচনা করেছিলেন। ভীষণ সুন্দর
এক গান।
প্রিয় শাহ্ আবদুল করিম সম্পর্কে আরো অনেক কিছু জানতে চাই, বুঝতে চাই, শিখতে চাই। কারণ, অনেক কিছুই এখনো জানার, বোঝার, শেখার বাকি। শাহ্ আবদুল করিমকে সঠিকভাবে মেলে ধরতে হবে নতুন প্রজন্মের সামনে; তাঁর জীবন-কর্ম-সাহিত্য-দর্শন ছড়িয়ে দিতে হবে দেশের প্রতিটি কোণে।
অসীম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রিয় শাহ্ আবদুল করিমের প্রতি। আপনি যেখানেই আছেন ভালো আছেন, এমনটাই আমার বিশ্বাস। কারণ আমি জানি, শুধুমাত্র গান ছাড়া আপনি আর কিছুই চান না।






No comments