ভ্রমণ ব্যাপারটি আজকাল অতিরঞ্জিত : আরাফাত হোসাইন

ভ্রমণ ব্যাপারটি  আজকাল অতিরঞ্জিত

আরাফাত হোসাইন


তুমি যত বেশি ভ্রমণ করতে থাকবে, ততোই জানবে, এই ব্রহ্মাণ্ডে তুমি কতই না ক্ষুদ্র; কতই না নস্যি।


কোথাও এমন একটা লেখা পড়েছিলাম। লেখাটা ঠিক কার, এই মুহুর্তে মনে করতে পারছি না। তবে, কথাটি সত্য। ভ্রমণ আমাদের অভিজ্ঞতা বাড়ায়, জ্ঞানের বিকাশ ঘটায় এবং দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়। ভ্রমণ বিস্ময়করভাবে খুলে দেয় আমাদের অন্তর্দৃষ্টি। তাতে কোনো সন্দেহ-ই নেই। কিন্তু আজকাল ভ্রমণ হয়ে উঠেছে ভীষণ মেকী, স্থুল এবং লোকদেখানো। আজকাল ভ্রমণ বিষয়টি আমার কাছে ওভাররেটেড তথা অতিরঞ্জিত। কেন আমার এমনটা মনে হলো? সেই কথাই আজ বলব।



একদল লোক বিছানাকান্দি যাচ্ছে, হৈ-হুল্লা করছে, সেই ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিচ্ছে; তাই আমাকেও যেতে হবে। সকলের মত আমাকেও সেখানে গিয়ে যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটাতে হবে। তা না হলে যেন রক্ষে নেই; বন্ধুমহলে মুখ দেখানো দায়।
একদল লোক যাচ্ছে রাতারগুল, সেন্টমার্টিন অথবা বালি, তাই যেতে হবে আমাকেও। তা না হলে ঠিক যেন মনের চাহিদা মিটছে না; মন আমার আনন্দিত হচ্ছে না। একবার কি ভেবে দেখেছেন, এই চাহিদাটা একান্তই আপনার তৈরি কী না? না-কী একদল লোক আপনাকে সেই চাহিদা তৈরি করতে আপনার মনের অজান্তেই আপনাকে প্রভাবিত করেছে? আপনি অন্যের চাহিদা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছেন না তো? আপনি যার বা যাদের চাহিদা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, সে বা তারাও অবচেতনে অন্য কারো চাহিদার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সেও আপনার মতই সেই চাহিদাটা কোথাও থেকে কুড়িয়ে পেয়েছিল। তাহলে এত কিছুর ভিড়ে আমাদের নিজস্ব চাহিদাটা কোথায়? কোথায় আমাদের স্বতন্ত্রতাটা? আজকাল এই ট্রেন্ডের যুগে, ট্রেন্ডের ঢেউ আমাদেরকে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, আমরা জানি না; জানার চেষ্টাও করছি না। প্রতিদিন-প্রতিমুহুর্তে গা ভাসিয়ে আমরা একটু একটু করে কি আমাদের থেকে হারিয়ে যাচ্ছি না? অনেকেই ভাবতে পারেন, ভ্রমণ নিয়ে আমার সমস্যাটা কোথায়? এত কথা বলছি কেন? ভ্রমণ নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নেই। কোনো কালেই ছিল না। আমি শুধু চাই আপনি আপনার মনের নিজস্ব কথাটি শুনুন, মনের ভাষাটিকে বুঝুন, আর সেটাকেই প্রাধান্য দিন। কে কোথায় যাচ্ছে, কি করছে, কি খাচ্ছে, কি পরছে এই সমস্ত বিষয়গুলো যেন আপনার আবেগকে, ইচ্ছাকে, চাহিদাকে, এবং আপনার সুখ-দু:খকে আপনার অজান্তেই নিয়ন্ত্রন না করে বসে। সেই ব্যাপারগুলো যেন আপনার আনন্দময় এবং স্বাধীন জীবনের ঘাতক প্রভাবক হয়ে না দাঁড়ায়। আপনি কি করবেন, কি করবেন না, কোথায় যাবেন, কোথায় যাবেন না, কি খাবেন, কি খাবেন না, কি পরবেন, কি পরবেন না, সেই সমস্ত সীদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীন, বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন একটা মানবিক অভাবনীয় শক্তি আপনার ভেতরে আছে। সেটাকে কাজে লাগান। নিজেকে নিজেই নিয়ন্ত্রন করুন; করতে শিখুন। নিজের আবেগ-অনুভুতি, সুখ-দু:খ নিয়ন্ত্রণ করার চাবি'টা অন্যের হাতে তুলে দেবেন না। কারণ জীবনটা আপনার। এবার আমার একটা উপলব্ধির কথা আপনাদের সাথে ভাগ করি।

তাজমহল


ধরুন, একজন ভারতীয় যিনি থাকেন আগ্রায়, ঠিক তাজমহলের পাশেই। দিনের পর দিন তাজমহল দেখতে দেখতে তিনি বেশ ক্লান্ত। তার কাছে সেই তাজমহলের কোনো আবেদন আর অবশিষ্ট নেই। এত সুন্দর এই অপূর্ব স্থাপনা'টি তাকে আর আগের মত আনন্দিত করে না, সুখ দেয় না। যেরকমটা সুখ তাকে দেয় ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ারের একটা স্থিরচিত্র। সেই ভারতীয় যিনি আগ্রায় থাকেন, তার অনেক ইচ্ছে - একদিন ফ্রান্সে গিয়ে সেই আইফেল টাওয়ার নিজের চোখে দেখবেন। সেই আশাতেই তিনি আজকাল প্রহর গুনছেন।



আইফেল টাওয়ার
আবার ধরুন, ঠিক সেই সময় একজন ফরাসী যিনি থাকেন আইফেল টাওয়ারের পাশেই। তিনি রোজরোজ সেই লোহালক্কড়ের টাওয়ার দেখে দেখেও একরকম বিরক্ত। সেই আইফেল টাওয়ার-ও তাকে আর আনন্দ দিতে পারছে না; কারন সেটা তার কাছে পুরোনো হয়েছে গেছে বলে। সেই ফরাসী অপেক্ষায় আছেন এই গ্রীষ্মের ছুটিতেই আগ্রায় গিয়ে তাজমহল দেখবেন। তাজমহলের কথা মনে হলেই তিনি আনন্দে আর উত্তেজনায় কেঁপে ওঠেন। এমনকি চোখ বন্ধ করে একবার তাজমহলের কথা ভাবলেও তার মনে একটা প্রশান্তি নিমিষেই চলে আসে।
অর্থাৎ আমরা বুঝলাম - কোনো স্থান, কাল, পাত্র এমনকি জগদ্বিখ্যাত কোনো দর্শনীয় স্থাপনার-ও মানুষকে সুখী করার 'মৌলিক' এবং 'সার্বজনীন' কোনো আবেদন বা ক্ষমতা নেই। থাকতে পারে না। এসবই আমাদের মানসিকতা। আমাদের তৈরি একটা ভ্রম অথবা বলা যায় অটোসাজেশন। এর কারণ হতে পারে আমাদের আবেগ-অনুভুতি, সুখ-দু:খ সবই দিনের পর দিন অতিমাত্রায় বস্তুকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে বলে। আমরা প্রচণ্ড মাত্রায় বস্তুবাদী হয়ে উঠছি বলে।
সুখ, আনন্দ, উল্লাস - বাইরে নয়, থাকে এই ভেতরে। আপনি কখন কোনটাকে ভোগ করবেন সেটা একান্তই আপনার নিজস্ব নির্বাচন। এখনই সময় এই সবকিছু নিয়ে আমাদের একটু স্থির হয়ে ভাবার।

No comments

Theme images by merrymoonmary. Powered by Blogger.