একজন বিশ্ববিখ্যাত লেখিকা; যিনি অন্ধ-বোবা-কালা! : আরাফাত হোসাইন

 

একজন বিশ্ববিখ্যাত লেখিকা; যিনি অন্ধ-বোবা-কালা!

 আরাফাত হোসাইন

 


“The best and most beautiful things in the world cannot be seen or even touched - they must be felt with the heart”

-Helen Keller

 

     বেশ কয়েকদিন আগে ইন্টারনেটে বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরল কিছু ছবি ঘাটতে ঘাটতে সহসাই একটা অদ্ভুত ছবির সন্ধান পাই। ছবিটিতে দেখা যায় একজন মধ্যবয়স্ক বিদেশিনী রবিন্দ্রনাথের গালে হাত দিয়ে খানিকটা অন্তরঙ্গ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন। ছবিটা দেখে প্রথমে বেশ অবাক হই। তারপর ধীরে ধীরে সেই ছবিটার প্রেক্ষাপটকে বোঝার চেষ্টা করি। আজকাল ইন্টারনেটের বদৌলতে কোনো কিছুই আর আমাদের আয়ত্ত্বের বাইরে নয়। একটার পর একটা পাতা খুলতে থাকি এবং সেই ছবিটির পেছনের গল্পটা জানবার চেষ্টা করি। অবশেষে আমি যা জানতে পারলাম, তা জেনে আমি রীতিমত হতবুদ্ধি! সেই বিদেশিনী, যিনি রবিন্দ্রনাথের গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন; তিনি ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত লেখিকা হেলেন কেলার। মূলত তিনি বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিকাউকে দেখতে হলে তাকে ছুঁয়ে দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় তাঁর ছিল না। তিনি তখন রবিন্দ্রনাথকে স্পর্শ করে ছুঁয়ে দেখছিলেন

 

হেলেন কেলার
 

     হেলেন কেলারের জন্ম ১৮৮০ সালের ২৭ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামায়। মাত্র ১৯ বছর বয়সে হেলেন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। কন্যার এই গুরুতর অসুস্থতা দেখে তাঁর পিতা-মাতা সকল রকমের আশা ভরসাই ছেড়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু মানসিকভাবে তখনও তাঁরা ঠিক ভেঙে পড়েননি।নতুন করে শুরু করলেন মেয়ের চিকিৎসা। বিভিন্ন ধরণের চিকিৎসা করার পর অবশেষে কিশোরী হেলেনের জীবনটি রক্ষা করা গেলেও তাঁর কথা বলা, শোনা এবং দেখার শক্তি চিরতরেই হারিয়ে যায়।

     হেলেন অবশ্য শিশুকাল থেকেই  বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিত্বের শিকার হয়ে নানান জটিলতা নিয়েই বড় হতে থাকেন। যখন তাঁর বয়স মাত্র ছয়, তখন হেলেনের বাবা-মা হেলেনকে সেই সময়ে ওয়াশিংটনের এক প্রসিদ্ধ বিজ্ঞানী তথা টেলিফোন আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের কাছে সঠিক পরামর্শের জন্য নিয়ে যান। হেলেন কেলারকে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর তিনি বলেন, হেলেন আর কখনোই চোখে দেখতে পাবে না এমনকি কানেও শুনতে পাবে না! তবে গ্রাহাম বেল, হেলেনের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা দেখে বলেছিলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যাবস্থা করা হলে স্বাভাবিক জীবনের কাছাকাছি একটি সুন্দর জীবন হেলেন ফিরে পেতে পারে।

হেলেন কেলার ও এনি সুলভিয়ান

     আট বছর বয়সে ‘এনি সুলভিয়ান’ নামে এক গৃহশিক্ষিকা হেলেনের পড়াশোনার সকল দায়িত্ব বুঝে নেন। আর এর মধ্য দিয়েই শুরু হয় তাঁদের মধ্যে ৪৯ বছরের একটি সুদীর্ঘ সম্পর্ক! হেলেনের গৃহশিক্ষিকা এনি নিজেও একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি ছিলেন। এনি প্রথমে আঙুল দিয়ে হেলেনের হাতে বিভিন্ন চিহ্ন এঁকে এবং এরপর বর্ণমালা কার্ড দিয়ে বর্ণমালা শেখান। তারপর ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়াশোনাও করেন হেলেন। নরওয়েতে উদ্ভাবিত এক বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করে মাত্র দশ বছর বয়সে নিজের মত করে কথা বলাও শিখেন তিনি। হেলেন কেলার ১৯০০ সালে রেডক্লিফ কলেজে ভর্তি হন। যেখানে তাঁর পরিচয় ঘটে বিশ্ববিখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েনের সাথে। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি হিসেবে সর্বপ্রথম হেলেন কেলারই ১৯০৪ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এটি ছিল তাঁর জীবনের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। অবশ্য  ডিগ্রি অর্জনের আগেই তাঁর আত্মজীবনী ‘দ্যা স্টোরি অব মাই লাইফ’  ১৯০৩ সালে প্রকাশিত হয়।

আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল, চার্লি চ্যাপলিন এবং মার্ক টোয়েনের সাথে হেলেন

     তাঁর মতই সমাজের অন্যান্য বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিদের জন্য তিনি তাঁর জীবদ্দশায় অনেক কিছুই করেছেন। ১৯১৫ সালে জর্জ কেলারকে সাথে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি সংস্থা। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সকল প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল, চার্লি চ্যাপলিন, মার্ক টোয়েন এর মত অনেক বিখ্যাত লোকদের থেকে বিভিন্ন সময়ে নানা রকম সহায়তা পেয়েছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি এখনও বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

     ১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের অনুরোধে হেলেন কেলার বিভিন্ন হাসপাতালে যুদ্ধাহত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধি নাবিক ও সৈনিকদের দেখতে যেতেন এবং তাঁদের মনে আশা যোগাতেন। নি:সন্দেহে তিনি ছিলেন এক মহৎ প্রাণ।

     বিশেষ করে সাহিত্যে হেলেন কেলারের অবদান সম্পর্কে আলোচনা না করলেই নয়। তিনি সর্বমোট ১২ টি বই রচনা করেছেন। এর মধ্যে থেকে বহুল আলোচিত বই ‘দ্যা স্টোরি অব মাই লাইফ’ , ‘লেট আস হ্যাভ ফেইথ’ , ‘দি ওয়ার্ল্ড আই লিভ ইন’ , ‘ওপেন ডোর’ ইত্যাদি। ইন্টারনেটের বদৌলতে এমন মহান এক মানুষ সম্পর্কে জানতে পেরে আমি সত্যিই ভীষণ রকমের আনন্দিত। বিশেষ করে তাঁর বইগুলো পড়ার সুযোগের জন্য আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।

     এছাড়াও হেলেন কেলার বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিদের বিষাদময় জীবনের ওপর একটি চলচ্চিত্র (Deliverance-1919) নির্মান করেন। সেই চলচ্চিত্রে তিনি নিজেই তাঁর নিজের ভূমিকায় অভিনয় করেন।  

     ১৯৬৮ সালে এই মহান মানুষটি পরলোক গমন করেন। তাঁর স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে এবং তাঁর অসামান্য কৃতিত্বের জন্য ১৯৭৭ সালে ‘আমেরিকান এসোসিয়েশন ফর দি ওভারসিজ ব্লাইন্ড’ যার বর্তমান নাম ‘হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল’ পুনর্গঠন করা হয়। মানবতার জয় হোক।

 


 

তথ্যসূত্র : Wikipedia

ছবি : Google

No comments

Theme images by merrymoonmary. Powered by Blogger.