কোনটি দেশপ্রেম? : আরাফাত হোসাইন

 কোনটি দেশপ্রেম?

আরাফাত হোসাইন



দেশের সংকটকালে-ক্রান্তিকালে জান-মাল দিয়ে সেই সংকট মোকাবিলা করে দেশকে রক্ষা করাটাই দেশপ্রেম।

আমাদের অনেকের কাছেই দেশপ্রেমের সার্বজনীন সংজ্ঞাটা অনেকটা এরকমই। সার্বিকভাবে বিচার করলে এতে দ্বিমত পোষণ করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু আজ আমি এই বিস্তৃত দেশপ্রেমের সংজ্ঞাটির অভ্যন্তরে গিয়ে এর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র, সুক্ষ্ম এবং প্রাথমিক মৌল উপাদান গুলোকে খুঁজে বের করবো এবং তা নিয়েই আলোচনা করবো।

সার্বিক ভাবে বিচার করলে একটি রাষ্ট্রের একজন অথবা গুটিকয়েক রাষ্ট্রপ্রধান, সেনা কর্মকর্তা, বিচারপতি কিংবা সীমান্তরক্ষাকারী বাহিনী; যারা রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ হিতকারি শুধুমাত্র এবং একমাত্র তাঁদেরকেই দেশপ্রেমিক বলে ভেবে নিয়ে আমরা অনেকেই ভুল করতেই পারি। নিঃসন্দেহে সেই শুরুর সংজ্ঞার আওতায় এসে তাঁরা দেশপ্রেমিক তো বটেই; তাতে কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই। একজন মানুষ দেশপ্রেমিক না হলে ঐসব অর্থবহ, ন্যায়পরায়ণ এবং দায়িত্বশীল কাজ কখনোই করতে পারে না। কিন্তু দেশপ্রেমের পরিধিটা আরো অনেক প্রশস্ত এবং বিস্তৃত। আর তাই আজ আমার আলোচনার বিষয় কিংবা ক্ষেত্র আরো অনেক গভীরে। আজ সেই সার্বজনীনতার গহীন হাতড়ে আরো গভীরে গিয়ে দেশপ্রেমের কিছু প্রাথমিক এবং সূক্ষ্ম আচার, ভাব, কার্যকলাপকে বের করে আনবো। দেশপ্রেমের স্বরূপকে খুব সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করবো।

অনেকেই ভাবতে পারেন পূর্বে উল্লেখিত রাষ্ট্রের সেইসব মহারথীরাই শুধুমাত্র এবং একমাত্র দেশপ্রেমিক অথবা দেশপ্রেমিক হওয়ার জন্য সকল অনুষঙ্গই তাঁদের আছে। ভাবতে পারেন, তাঁদের মতো করে তাঁদের সমকক্ষীয় দেশপ্রেমিক হওয়ার সুযোগ বোধয় আপনার অথবা কারোই নেই। আরো ভাবতে পারেন, বিশেষ কিছু পরিবেশ, পরিস্থিতি, বা বিশেষ কিছু অনুষঙ্গের অভাবে তাঁদের মতো করে আপনার দেশপ্রেমিক হয়ে উঠাটা বোধয় কখনই সম্ভব নয়।
প্রথমত, কোনো ব্যাক্তি বিশেষের দেশপ্রেমকে পরিমাপ করার কোনো যন্ত্র নেই। কারো দেশপ্রেম বেশি, আবার দেশের প্রতি কারো ভালোবাসা, মায়া-মমতা কম এমনটাও হয় না। হয় শুধু দেশপ্রেমিক অথবা দেশদ্রোহী। এর মাঝামাঝি কিছু নেই।

একজন ঝাড়ুদার যিনি প্রতিদিন নিজের কাছে এবং নিজের কাজে সৎ থেকে প্রাত্যহিক কর্মদিবসে নিয়ম করে রাজপথ ঝাড়ু দেন, তিনি দেশপ্রেমিক। একজন চায়ের দোকানদান যিনি তার দোকানে আসা সকল খরিদ্দারদেরকে আগ্রহের সাথে চা পান করান, তিনি দেশপ্রেমিক। একজন কিশোর-যুবক-বৃদ্ধ যে-ই হোক, যিনি পথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখতে পায় কোনো প্রতিবন্ধক এবং অন্য কারো কষ্ট হতে পারে ভেবে সেটিকে সচেতনভাবে সড়িয়ে রাখে এবং পথকে সুগম করে, সে দেশপ্রেমিক। একজন শিক্ষার্থী, যে মানুষের মতো মানুষ হবার লক্ষ্যে জ্ঞান অর্জন করে, সে দেশপ্রেমিক। একজন শিক্ষক যিনি তাঁর শিষ্যদের আদর্শবান মানুষ হতে প্রতিনিয়ত উদ্বুদ্ধ করে, অনুপ্রাণিত করে, তিনি দেশপ্রেমিক। একজন প্রকৌশলী, যিনি নিষ্ঠার সাথে ইমারত এবং সেতু নির্মান করেন, তিনি দেশপ্রেমিক। একজন জননেতা, যিনি জনগনের স্বার্থে শুধুমাত্র তাঁদেরই উন্নতির জন্য নিজের স্বার্থ ত্যাগ করতেও দ্বিধা করেন না, তিনি দেশপ্রমিক।

মোদ্দাকথা, আপনি কে, কী আপনার পরিচয়, কী আপনার অর্থনৈতিক অবস্থান, অথবা কী আপনার পদমর্যাদা; আদর্শ দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নগুলো রীতিমত অবান্তর, অপ্রাসঙ্গিক। আপনি নিজের কাছে এবং নিজের কাজে শতভাগ সৎ থেকে পূর্ণ উদ্যমে হিতকর যেই কাজটিই করছেন বরং সেটিই বেশি প্রাসঙ্গিক, যথাযথ এবং আলোচ্য।

একজন নরসুন্দর, সুন্দর করে খরিদ্দারের চুল কাটবে, একজন চর্মকার সুন্দর করে জুতো তৈরি করবে, একজন রাষ্ট্রপ্রধান রাষ্ট্রের সুনাম বজায় রাখতে প্রাণপণ কাজ করবে, তেমনি একজন তরুণ তাঁর মেধাকে কাজে লাগিয়ে দেশকে নিয়ে যাবে বিশ্বের দুয়ারে। আর এসবই দেশপ্রেমের স্বরূপ।







No comments

Theme images by merrymoonmary. Powered by Blogger.